মহামারিতে অসহায়ের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বেহেশতের সুসংবাদ!

মহামারি, খড়া, বন্যা, দুর্যোগ-দুর্বিপাক মানুষকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। তখন অনেকে জীবন কি বুঝতে শুরু করে। সাধারণ জীবন যাপনে অনেকে জীবনের কাঠিন্যতা উপলব্দি করতে পারে না। সৌখিনতার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করে।
মহামারির সময় মানুষ বুঝতে পারে জীবনের বাস্তবতা কি।

জীবন কতো কঠিন ও নিষ্ঠুর বাস্তবতার নাম। এই সময়টা মানুষ ধর্মকর্মে মন দেয়। ধর্মভীরু হয়ে ওঠে। মানুষের মন নরম ও কোমল হয়ে যায়। তখন মানুষ আল্লাহর ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে আত্মবিশ্লেষণের সুযোগ পায়। তাই, মহামারিসহ অন্যান্য মানবিক বিপর্যয়ে মানবতার পাশে দাঁড়ানো দলমত-নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার ধর্মপ্রাণ মানুষের অবশ্যকর্তব্য।

মহামারির কারণে সৃষ্ট খাদ্য সঙ্কটে অসহায় গরিব হতদরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত। বিত্তশালী মানুষের উচিত এই সময়টা নিজের আশপাশের মানুষের প্রতি সদয় হওয়া। ওষুধ খাদ্য বাসস্থান যেখানে যা প্রয়োজন তা দিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। মহামারি এমন যে তার মধ্যে খাদ্য সঙ্কট সৃষ্টি হবেই হবে। আর এগুলো মানুষের পরীক্ষার জন্য আল্লাহ দিয়ে থাকেন।

এখানে দুই শ্রেণির মানুষের দুই ধরণের পরীক্ষা। যারা অসহায় তাদের জন্য ধৈর্য ও সবরের পরীক্ষা। আর যারা বিত্তশালী তাদের জন্য অসহায়কে সহায়তা করা না করার পরীক্ষা। আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন। এ মর্মে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,

وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ

অর্থ : নিশ্চয়ই আমি (আল্লাহ) তোমাদের ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা অবশ্যই পরীক্ষা করব। তুমি ধৈর্যশীলদের শুভ সংবাদ দাও, যারা তাদের ওপর বিপদ আপতিত হলে বলে, আমরা তো আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চিতভাবে তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী। (সূরাতুল বাকারাহ : আয়াত নম্বর ১৫৫-১৫৬)।

বর্তমান সময়টি একটি মহামারির সময়। পুরো পৃথিবী জুড়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ইউরোপ আমরিকা আজ বিধ্বস্ত চৌচির। পুরো পৃথিবীর অর্থনীতি নাশপ্রায়। অর্থনীতির এই ভঙ্গুর ধাক্কা আমাদের দেশেও লেগেছে। খাদ্য সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। এখনো সেইভাবে খাদ্য সঙ্কট দেখা দেয়নি করোনার মহামারিতে। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে অল্পকদিনের মধ্যেই দেখা দেবে। খাদ্য সংকটে ভোগবে হাজার হাজার মানুষ। বিশেষ করে বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির সবাই খাদ্যহীনতায় ভোগতে পারে।

তাই, এই সময়টা আমাদের বিত্তবানদের কাছে বিশেষ অনুরোধ থাকবে; অসহায় দীনদরদি মানুষের পাশে দাঁড়াতে। অসহায় সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে ইসলাম ব্যাপক নির্দেশনা ও উৎসাহ প্রদান করেছে। যে ব্যক্তি সুযোগ থাকার পরও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায় না, তাকে আল্লাহ পছন্দ করে না।

يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَى بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْ هَـذَا مَا كَنَزْتُمْ لأَنفُسِكُمْ فَذُوقُواْ مَا كُنتُمْ تَكْنِزُونَ

অর্থ : সে দিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তার দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশকে দগ্ধ করা হবে (সেদিন বলা হবে), এগুলো যা তোমরা নিজেদের জন্যে জমা রেখেছিলে, সুতরাং এক্ষণে আস্বাদ গ্রহণ কর জমা করে রাখার। (সূরাতুত তাওবাহ : আয়াত নম্বর ৩৫)।

এই আয়াতে ওই সব লোকদের হুঁশিয়ারি করা হয়েছে যারা তাদের মাল অর্থ সম্পত্তির ব্যাপারে কৃপণতা করেছে। যারা মানুষের অসহায় সময়ে দান সদকা করে মানুষের পাশে থাকেনি। এই ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন সঙ্গে সঙ্গে দাতার সুসংবাদের কথাও বলেছেন।

السخيُّ قريب مِن الله، قريب من الجنة، قريب مِن الناس، بعيد من النار، والبَخيل بعيدٌ مِن الله، بعيد من الناس، قريب مِن النار، ولَجاهل سخيٌّ أحب إلى الله عز وجل من عابد بخيل

অর্থ : দানশীল আল্লাহর নিকটবর্তী। আর যে আল্লাহর নিকটবর্তী হবে সে জান্নাতের অধিবাসী হবে ও সে মানুষের কাছে প্রিয় হয়ে উঠবে। জাহান্নাম থেকে বহুদূরে থাকবে। আর কৃপণ আল্লাহর থেকে দূরবর্তী। আর যে আল্লাহর থেকে দূরবর্তী সে জাহান্নামের অধিবাসী। মানুষের কাছে অপ্রিয় এবং জাহান্নামের নিকটবর্তী। কৃপণ ইবাদতকারী থেকে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় অজ্ঞ দানশীল। (আবু দাউদ)।

এই হাদিসের সঙ্গে সঙ্গে আমরা আরো হাদিস উল্লেখ করতে চাই। যেটি মূলত একটি দোয়া যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত পাঠ করতেন,

أعوذُ بك مِن البُخل والكسل،

অর্থ : হে আল্লাহ! আপনার নিকট কৃপণ ও অলস থেকে পানাহ চাই।

উল্লেখিত কোরআন হাদিস সামনে রেখে আমরা বলতে পারি ভয়াবহ দুঃসংবাদ হলো তাদের জন্য যাদের সামর্থ থাকার পরও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি। সুতরাং বর্তমান সময়ের মহামারিতে বেশির ভাগ মানুষ খাদ্য সঙ্কটে ভুগছে। তাই বিত্তবান মানুষের প্রতি রাসূলুল্লাহ এর একটি নির্দেশনা পেশ করছি, তোমরা ক্ষুধার্তকে খাদ্য দাও, অসুস্থ বা রুগ্ন ব্যক্তির সেবা করো এবং বন্দিকে মুক্ত করো অথবা ঋণের দায়ে আবদ্ধ ব্যক্তিকে ঋণমুক্ত করো। (বুখারী)।

যদি কেউ রাসূলুল্লাহ এর নির্দেশনা পালন করে তার কি উপকার হবে সেই কথা বর্ণিত হয়েছে রাসূলের আরেক বাণীতে ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুনিয়াতে মানুষকে খাদ্য দান করবে, কিয়ামতের দিন তাকে খাদ্য দান করা হবে। যে আল্লাহকে খুশি করার জন্য মানুষকে পানি পান করিয়েছে, তাকে সেদিন পানি পান করিয়ে তার পিপাসা দূর করা হবে। যে মানুষকে বস্ত্র দান করেছে, তাকে সেদিন বস্ত্র পরিধান করিয়ে তার লজ্জা নিবারণ করা হবে। (আবু দাউদ)।

এই অসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ালে আল্লাহ কিয়ামতের দিন মানুষের পাশে দাঁড়াবে। যে দিন কোনো সাহায্যকারী থাকবে না। অসহায় মানুষকে অন্নদান, মহামারিতে অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো, গরিবদের সহায়তা প্রদানকারীর ব্যাপারে বেহেশতের সুসংবাদ দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন, ‘একটি রুটি দানের কারণে তিন ব্যক্তিকে জান্নাতে পাঠানো হবে। ১. আদেশদাতা, ২. ত্রাণ প্রস্তুতকারক ৩. ত্রাণ পরিবেশক- অর্থাৎ যে ত্রাণ নিয়ে গরিবের ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। (হাকিম, তাবারানি) এই হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারি-

যদি আমি সাহায্য নাও করতে পারি; কমপক্ষে আমি সাহায্যের ব্যবস্থা করে দিই। কিভাবে মানুষ সাহায্য পেতে পারে সেই পথ ও পদ্ধতি বলে দিই। বিত্তশালীদেরকে দানে উদ্বুদ্ধ করি। তাহলে আমিও হাদিসে বর্ণিত তিন শ্রেণির একজন হয়ে যাবো ইনশাল্লাহ! সাহায্য করার ফজিলতের আরেকটি হাদিসে বর্ণনা করে প্রবন্ধটি শেষ করছি।

বুখারীর এক বর্ণনায় এসেছে ‘কেউ যদি হালাল আয় থেকে দান সাদকাহ ও সাহায্য করে আল্লাহ নিজে সেই দান সাদকাহ ও সাহায্য গ্রহণ করেন, সেটি উত্তমরূপে সংরক্ষণ করেন। একসময় সেই দান সাদকাহ ও সাহায্যের নেকি পাহাড় তুল্য হয়ে যায়।

তাই আসুন; আর্তমানবতার সেবায় নিজ উদ্যোগে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে সমাজের অসহায় দীন দরদি মানুষের পাশে দাঁড়াই। যদি আমরা এই সময়ে একে অপরের পাশে দাঁড়াতে পারি তাহলে মহামারি আমাদের ততটা ক্ষতি করতে পারবে না, যতটা ক্ষতি করবে একে অপরের পাশে না দাঁড়ালে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বুঝার তৌফিক দান করুন। আমিন।